প্রধান সূচি

নতুন স্বপ্ন এখন ওদের চোঁখে

Nazirpur-Pic-Hakim

কয়েক মাস আগেও যারা পরিবার ও সমাজের চোখে অবহেলিত ও ঘৃণিত ছিল, একটি অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ এখন তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে। সামাজিকভাবে আরো একটু ভালবাসা পেলে তারাও এদেশের মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে। দেশের অগ্রযাত্রায় তারাও হতে পারে কালের স্বাক্ষী। সমাজ ও আইনের চোখে অপরাধী এমন ৭৩ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীকে আলোর পথে আনতে সহায়তা করেছেন পুলিশ।

বাংলাদেশ পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বিপিএম ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট বরিশালে যোগদানের পর তার আওতাভুক্ত বরিশাল রেঞ্জকে মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর পিরোজপুর জেলা পুলিশের আয়োজনে পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কমিউনিটি পুলিশিং ও জঙ্গিবাদ বিরোধী এক সভায় ৭৩ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর তাদেরকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের শপথ বাক্য পাঠ করান ডিআইজি। এসময় এসব বিপথগামীদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা পুলিশের উদ্যোগে কর্মস্থানের জন্য বিভিন্ন উপকরণ উপহার দেয়া হয়।

জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭৩ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী পুলিশের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করে সব ধরনের অন্যায় ও মাদকমুক্ত হতে শপথ গ্রহণের ৪ মাস পর সম্প্রতি তাদের খোঁজ-খবর নিতে আবারও ডাকা হয় পিরোজপুর পুলিশ লাইনে।

এসব মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের নতুন জীবন কেমন চলছে তা সরেজমিনে দেখতে গিয়ে কথা হয় নাজিরপুরের উত্তর লেবুজিলবুনিয়া গ্রামের হাকিম হাওলাদারের সাথে। তিনি জানান, ৭ সন্তান নিয়ে সাংসারিক অভাব-অনটনের কারণে দিশেহারা হয়ে সঙ্গ দোষে মাদকাসক্ত হয়ে পরি। এভাবে কিছুদিন চলার পর জড়িয়ে পরি মাদক ব্যবসায়। দু’দুবার গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কয়েক মাস জেলও খেটেছি। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে সামাজিকভাবে অনেকটা হেয়প্রতিপন্নও হতে হয়েছে। কয়েকমাস আগে বৈঠাকাটা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ অনুপ কুমার মন্ডলের অনুপ্রেরণায় পিরোজপুরে যাই। সেখানে মাদক ছেড়ে দিলে সব ধরনের সহায়তা করবেন ডিআইজি সাহেবের এমন আশ্বাসে মাদক ছেড়ে দেয়ার শপথ নিয়েছি। সেই থেকে এলাকায় একটি চায়ের দোকান করেছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। পরিবার ও সমাজের মানুষও এখন আমাকে অনেক ভালবাসে।

মাদক সেবন করতে করতে এক সময় ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেন নাজিরপুরের রুহিতলাবুনিয়া গ্রামের আলকাস ভূইয়া। তার বিরুদ্ধে নাজিরপুর থানায় রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। গ্রেফতারও হয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। মাদক ব্যবসা ও সেবন ছেড়ে দেয়ার পর জেলা পুলিশ তাকে কিছু নগদ অর্থ সহায়তা দেন। আলকাস বলেন, মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরব সেটা চিন্তাও করতে পারিনি। আমি এখন স্থানীয় দিঘীরজান বাজারে মাংসের ব্যবসা করে অনেক ভালো আছি। তিনি আরো বলেন, ‘মাদকের কারণে পরিবার আত্মীয়স্বজন কেউ পরিচয় দিত না। পরিবারের কারও কাছে আমার কোনো মূল্য ছিল না। মানুষ নেশাখোর বলে ডাকত। শুনে খারাপ লাগলেও মাদক ছাড়তে কাউকে পাশে পাইনি। অবশেষে পুলিশ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।’

আরেক মাদক ব্যবসায়ী নাজিরপুরের উত্তর লেবুজিলবুনিয়ার আলীম সরদার বলেন, ‘মাদকের কারণে অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। আমাকে দিয়ে কিছু হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠন কনসার্টেড ইম্পিরিয়্যাল ক্লাবের উৎসাহে মাদক ছেড়েছি। বাকি জীবন সুন্দর করে বাঁচতে চাই। ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল চালিয়ে এখন আমি পরিবার নিয়ে অনেক ভাল আছি।’

নাজিরপুরের মুগারঝোর গ্রামের মাদকসেবী সাদ্দাম এখন বৈঠাকাটা বাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ২ মাস হাজতবাস করেছি। নাজিরপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমানের কথায় মুগ্ধ হয়ে মাদক ছেড়ে দেয়ার শপথ নিয়েছি। এনজিও থেকে লোন নিয়ে এখন ব্যবসা করে ভাল আছি।’

নাজিরপুরের পাতিলাখালী গ্রামের মাদকসেবী হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘আমি পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে মাদকাসক্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। নাজিরপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান স্যার আমাকে বরিশালে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ৩ মাস রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। এই তিন মাস তিনি আমার পরিবারের খরচও বহন করেছেন। আমি এখন সুস্থ হয়ে দিনমজুরের কাজ করে পরিবার নিয়ে ভাল আছি।’
নাজিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নাজিরপুরকে মাদকমুক্ত করার সব ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছি এবং তা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে পূর্বের তুলনায় মাদকের প্রভাব অনেকটা কমে গেছে। ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের উদ্যোগে উপজেলার ১৫ জন মাদকসেবী ওব্যবসায়ী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।’

পিরোজপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবির বলেন, ‘মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অঙ্গীকার করেছে আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত তাদের খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। যারা নিজেদের ভুল বুঝে ইতোমধ্যে এ অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা পরিচালনার জন্য লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে তাদের আইনি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।’

বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বিপিএম বলেন, ‘মাদকসেবী বা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি কোন বরাদ্ধ নেই। সংশ্লিষ্ট এলাকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তিদের উৎসাহিত করে তাদের সহায়তা নিয়ে মাদকসেবী বা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেসব মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে তাদেরকে একত্রিত করে অঞ্চল ভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।’