প্রধান সূচি

রাজধানীতে বাসে যৌন হয়রানি; পুলিশের কাছে আরও হয়রানি

Sexual-harassment-in-buses-

‘আপা, এটা নিয়ে আর বেশি দূর না যাওয়াই ভালো। আপনি মহিলা মানুষ, মামলা হলে সেটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে কষ্ট হবে। এই বলে আমার অনুমতি না নিয়েই ছেলেটাকে (অপরাধী) ছেড়ে দেয় পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই আব্দুল মজিদ। এমনকি বিষয়টি থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসিকে জানাতে গেলে উল্টো দুর্ব্যবহার করে থানা থেকে বের করে দেয় আমাকে।’

যৌন হয়রানির প্রতিবাদে বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো পুলিশের কাছে হেনস্তার শিকার হোন এমনটাই অভিযোগ করেন সুলতানা বাশার (ছদ্মনাম) নামে এক নারী।

গত ২৫ এপ্রিল বুধবার আজিমপুরে ঠিকানা বাসের মধ্যে তিনি যৌন হয়রানির শিকার হোন। পরবর্তীতে লালবাগ থানায় বিচার চাইতে গেলে আরও হয়রানির শিকার হোন।

সুলতানা নামের ওই চাকরিজীবী বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হঠাত মুষলধারে বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হয়। আমি আর আমার আরেক সহকর্মী মোহাম্মদপুরের আসাদ গেট থেকে ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসে উঠি। সামনের দিকে আসন ফাঁকা না থাকায় আমরা দুজন পিছনের দিকেই বসি।’

তিনি জানান, হঠাৎ পেছনে থেকে কয়েকজন যুবক আমাদের উদ্দেশ করে কুরুচিপূর্ণ সব কথা বলতে থাকলো। নোংরা বিচ্ছিরি সব কথা বলতে বলতে হাসাহাসি করতে লাগলো। এ সময় প্রতিবাদ করতে গেলে অন্যান্য পুরুষ যাত্রীরা পর্যন্ত ঐ দুই যুবকের পক্ষ নেয়। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন।

আজিমপুর পৌঁছলে বাস থেকে নেমে পুলিশকে অভিযোগ করেন সুলতানা। এরপর লালবাগ থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল মাজিদ বাস থেকে অভিযুক্ত যুবককে আটক করে আজিমপুরের একটি দোকানের সামনে নিয়ে যান।

সুলতানা বলেন, তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে চাইলে পুলিশের কনস্টেবল বিশ্বনাথ বলেন, ‘নারীরা তো ইভটিজিংয়ের শিকার হবেই।’ এ সময় অভিযুক্ত ওই যুবক এএসআই মাজিদের সঙ্গে পাশে গিয়ে একান্তে কথা বলছিলেন।

পরে এই পুলিশ কর্মকর্তা ওই নারীকে বলেন, ‘আপা, এটা নিয়ে আর বেশি দূর না যাওয়াই ভালো। আপনি মহিলা মানুষ, মামলা হলে সেটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে কষ্ট হবে।’

এরপর ওই যুবককে ‘সরি’ বলতে বলেন এএসআই মাজিদ। এরপর অভিযোগকারীর অনুমতি ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেন তিনি।

সুলতানা বলেন, ‘পুলিশের এএসআই থেকে সহযোগিতা না পেয়ে আমি ও আমার মা পরে লালবাগ থানার ওসির (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) রুমে গিয়ে বিষয়টি বললে তিনি এএসআই মাজিদকে ডেকে পাঠান। পরে আসছি বলে আর ওসির রুমে না এলে আমরা ওসিকে বলি, আপনি থানার বড় কর্মকর্তা। আমাদেরও অনেক আত্মীয় আছে পুলিশে।’

“এই কথা বলতেই ওসি আমাদের ওপর ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘আপনাদের বড় অফিসার আছে সেখানে যান’, বলে তার রুম থেকে বের করে দেন।” বলে জানান সুলতানা।

কোন কর্তৃত্ববলে অভিযোগকারীর অনুমতি ছাড়া ‘হয়রানিতে’ জড়িত যুবককে ছেড়ে দিয়েছেন- জানতে চাইলে এএসআই আব্দুল মাজিদ বলেন, ‘ঘটনার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি ও আমার ফোর্স সেখানে গিয়ে অভিযুক্ত যুবককে আটক করি। কিন্তু স্থানীয়রা ও বাসের অন্যান্য যাত্রীরা ওই নারীকে বলল, এটা নিয়ে আর বেশি দূর না যাইতে। আর যুবকদের মাফ চাইতে। পরে ওই যুবক মাফ চাইলে আমি ছেড়ে দিই।’

যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন যিনি তার অনুমতি না নিয়ে অন্যদের কথায় ছেড়ে দেয়ার কি নিয়ম তা জানতে চাইলে এএসআই মজিদ বলেন, “আপনি তো ঘটনার সময় ছিলেন না, তাই পরিস্থিতি না জেনেই প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। আমি এখন ব্যস্ত। পরে ফোন দিবেন। এই বলেই ফোন রেখে দেন।”

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুভাষ চন্দ্র পাল বলেন, ‘ঘটনার পর আমার অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে তারা থানায় এসেছিল। তবে তাদের ব্যবহার বা আচরণগত সমস্যা ছিল।’

আচরনগত সমস্যার কারণে কি কারো অভিযোগ গ্রহণ করা হয়না, সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেন নি।

সুলতানা বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই বুঝতে পারছিনা যে কেউ কোনো অভিযোগ করলে তার সাথে কথা না বলে কিংবা ঘটনা কি ঘটেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে কিভাবে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়। এমনকি সে বিষয়ে জানতে চাইলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পর্যন্ত কেনো দুর্ব্যবহার করে উল্টো থানা থেকে বের করে দেন।’

সূত্র: বিডিমর্নিং