প্রধান সূচি

মেসির খোলা চিঠি, আমার ওপর বিশ্বাস রেখো আর্জেন্টিনা

masy

প্রিয় আর্জেন্টিনা

এই চিঠি তোমাকে লিখছি বটে, কিন্তু তা খামবন্দি করে রেখে দিচ্ছি এখন। যদি বিশ্বকাপ জিততে পারি, তাহলেই শুধু এটি আকাশি-নীলের ঠিকানায় পাঠাব। নইলে স্মৃতির নীল খামে বন্দি করে রেখে দেব নিজের কাছে। অনেক অনেক অনেক বছর পর আমি যখন বুড়ো হয়ে যাব, থিও-মাতেও-সিরো বড় হবে—তখন ওদেরকে দেখাব এটি। কারণ সন্তানদের কাছে দায়বদ্ধতার ঋণে আমি আটকা পড়ে থাকতে চাই না।

আমি নিজে তো তোমার সন্তান। আর্জেন্টিনার সন্তান। তোমার কাছেও আমার ঋণের শেষ নেই। সেই ঋণ শোধের বড় এক সুযোগ এই বিশ্বকাপে। ৩২ বছর পর আবার যদি তোমাকে ওই সোনার ট্রফিটা উপহার দিতে পারি! প্রথম দুই ম্যাচ জয়হীন থাকার পর কাজটি কঠিন হয়েছে বটে। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি। স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। এই স্বপ্নই আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

পুরো পৃথিবী আমাকে নিয়ে উৎসবে মত্ত থাকতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত আমি আর্জেন্টিনার সেই ছোট্ট ছেলেটি। রোসারিওর সেই বালক, যার জীবনে ফুটবল ছাড়া আর কিছু নেই। প্রিয় জন্মভূমিকে আমি ততটাই ভালোবাসি, যতটা আর কিছুকে নয়। তোমার জার্সিতে খেলা আমার জীবনের পবিত্রতম অর্জন। আর যদি বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারি, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি মানবজন্মে হতে পারে না।

আমাকে ঘিরে তোমার প্রত্যাশার কথা জানি। জানি আমার দিকে তাকিয়ে আছে তোমার মাটির চার কোটি ৪০ লাখ আর্জেন্টাইন সন্তান। সবুজ এই গ্রহের আরো শত কোটি আর্জেন্টিনার সমর্থকও। রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে আমি সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দলের পরাজয়ে ছিলাম অসহায় দর্শক। কিন্তু বিশ্বাস করো, এতে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে যে কারো চেয়ে বেশি। বিরুদ্ধ পরিস্থিতি পাল্টে আর্জেন্টিনাকে নক আউট পর্বে নিয়ে যাওয়ায় আমার প্রতিজ্ঞাও যে কারো চেয়ে বেশি এখন।

এই তো দিন দুয়েক আগে হয়ে গেল আমার ৩১তম জন্মদিন। গেল তিনটি বিশ্বকাপের মাঝেও পড়েছিল এই দিনটি। সেগুলো কত আনন্দময়ই না ছিল! ২০০৬ সালে শেষ ষোলোতে হারাই মেক্সিকোকে। সে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলাম ১৯ বছরের আমি। ওই দিনটিই আমার জন্মদিন। ২০১০ সালের জন্মদিন পড়ে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ জেতার পর; দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলার আগে। আর ২০১৪ সালে গ্রুপের প্রথম দুই ম্যাচ জেতার পর। সতীর্থদের সঙ্গে কেক-টেক কেটে কী দারুণ উদ্‌যাপন ই না করেছি প্রতিবার।

এবারের পরিস্থিতি আলাদা। প্রথম দুই খেলায় জিততে পারিনি। এ অবস্থায় জন্মদিনের উৎসব করি কী করে! ব্রোনোিস আমার জন্য সেজেছিল সত্যি; মস্কোর এক বিখ্যাত বেকারি থেকে আমার প্রমাণসাইজের মূর্তির আকারে কেক পাঠানো হয়। তবে আমি জন্মদিন উদ্‌যাপন করি সতীর্থদের সঙ্গে ছোট্ট করে। সেটিও করতাম না, কিন্তু দলের গুমোট আবহ কাটানোর জন্য এটিকে ভালো উপায় মনে হয়েছে আমার কাছে।

আমাদের দলে বিভেদ নিয়ে অনেক গুঞ্জন চারপাশে। কোচ হোর্হে সাম্পাওলির বিপক্ষে আমাদের বিদ্রোহ নিয়েও অনেক কথা। কিন্তু প্রিয় আর্জেন্টিনা, আমি তোমাকে নিশ্চিত করছি, অমন কিছু হয়নি। হবেও না। কারণ আমাদের সবার স্বপ্ন এক। সবাই মিলে একাট্টা থেকেই তোমাকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে চাই। নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করা যে এ অবস্থায় সেই সম্ভাবনার আত্মহত্যার শামিল, সেটি কি আর আমি বুঝি না!

ওই ছোট্ট বয়সে অনেক কিছুই বুঝতাম না সত্যি, যেদিন আমাকে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবের পক্ষ থেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্লাবে সব সতীর্থ ধেই ধেই করে বড় হয়ে যাচ্ছিল, আমার উচ্চতা বাড়ছিল না কিছুতেই। আমার খেলা দেখে আশপাশের সবাইকে বলাবলি করতে শুনতাম, ‘এ ছেলেটি নতুন ম্যারাডোনা’। ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তুমি ম্যারাডোনার চেয়ে ভালো ফুটবলার হতে পারবে কি না, তবে আমি তোমাকে ওর চেয়ে লম্বায় বড় করে দিতে পারব।’ হরমোনের সেই সমস্যা উতরে ঠিকই ১.৬৯ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছি আমি; ডিয়েগোর চেয়েও দুই সেন্টিমিটার বেশি যা।

আমি কিন্তু কখনো ডিয়েগো হতে চাইনি। সেটি আমি পারবও না। এমনকি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতালেও না। আমি শুধু চাই, ডিয়েগোর মতো তোমাকে একটি বিশ্বকাপ উপহার দিতে। ব্যস!

হরমোনের ওই সমস্যার দিনগুলোতে আমাকে যে কত কষ্ট করতে হয়েছে, সেটি তো তুমি জানো। প্রতি মাসে দেড় হাজার ডলার করে লাগত। বাবার সামর্থ্য ছিল না সেটি জোগানোর। নিউওয়েলস ক্লাবেরও তখন কঠিন অবস্থা। তারাও খুব বেশি দিন সাহায্য করতে পারেনি। আমার প্রিয় খেলোয়াড় পাবলো আইমারের রিভার প্লেটের ট্রায়ালে গিয়ে ওদের মন জয় করি। তবে সমস্যা সেই চিকিৎসার টাকা দেওয়াতে। বাধ্য হয়েই তাই আমার তোমাকে ছাড়তে হয়, আর্জেন্টিনা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গিয়ে যোগ দিই বার্সেলোনায়। আমার চিকিৎসার অর্থ ওরা জোগাবে বলে।

কিন্তু মনটা আমার সব সময় পড়ে থাকত তোমাতেই; ওই ছোট্ট শহর রোসারিওতে। বাবার সঙ্গে বার্সেলোনায় থাকি; মা ও ভাই-বোনরা থাকেন আমার জন্মভূমিতে, ওখানকার ইসরায়েল স্ট্রিটে বন্ধুরা খেলা করে আগের মতোই, তত দিনে পরিচয় হয়ে যাওয়া আমার প্রিয়তমা আন্তনেলা রোকুজ্জোও সেখানে—দিনগুলো কী দুঃসহ যে গেছে, তুমি তো জানো প্রিয় আকাশি-সাদা! প্রতিদিন হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার সময় আমার কষ্ট লাগত না, কষ্ট লাগত শুধু সবাইকে ছেড়ে একা একা থাকায়। তখন আশ্রয় খুঁজেছি ওই ফুটবলে।

ফুটবল আমাকে সব দিয়েছে পরবর্তী সময়ে। বার্সেলোনার জার্সিতে পেয়েছি সম্ভাব্য সব সাফল্য। ব্যক্তিগত কত পুরস্কারে উজ্জ্বল আমার ক্যারিয়ার! কিন্তু বিশ্বাস করো, সব কিছুর বিনিময়ে আমি শুধু তোমার জার্সিতে সাফল্য চেয়েছিলাম, প্রিয় আর্জেন্টিনা। এখনো তা-ই চাই। ২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালের হারটাও ছিল কষ্টদায়ক। তবে আমার হৃদয়ে বেশি হাহাকার তোলে শেষ তিনটি ফাইনাল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের বেদনা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভুলতে পারব না। পরের বছর কোপা আমেরিকা ফাইনালে গিয়েও একটুর জন্য পারলাম না। পরেরবারও তা-ই। সেবার তো আবেগে ভেসে অবসরের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে নিই। পরে মনে হয়, কেন আমি তা করব! কেন ভালোবাসার জন্মভূমি তোমার জন্য শেষ ঘামবিন্দু দিয়ে লড়ব না! সে কারণেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফিরেছি তোমার আকাশি-সাদায়। আমার ভালোবাসার রঙে।

আমাদের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে এখন হয়তো কেউ সেভাবে কথা বলবে না। সেটি তো বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচের সময়ও সমালোচকরা বলেছিল, রাশিয়ায় যেতে পারব না। ইকুয়েডরের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ঠিকই তোমার পতাকা নিয়ে এসেছি বিশ্বকাপে। সে পতাকা প্রথম রাউন্ডেই নেমে যাবে, তা আমি হতে দিই কী করে!

প্রিয় আর্জেন্টিনা, তোমাকে তাই আমি কথা দিলাম। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দলকে জেতাবই। দলকে নক আউট পর্বে নিয়ে যাবই। আমাদের স্বপ্নের পতাকা ওড়াবই বিশ্বকাপে। এরপর কী হবে, অদৃষ্ট ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু নিজের সর্বোচ্চ-সর্বস্ব আমি নিংড়ে দেব। কথা দিলাম।

শেষ বেলায় তোমাকে আবার বলি ভালোবাসার জন্মভূমি, আমি ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে যেতে চাই না। আমি সর্বকালের সেরা ফুটবলার হতে চাই না। আমি শুধু চাই, ১৫ জুলাই ওই ছোট্ট সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে। চাই, ১৬ জুলাই আমার প্রিয় জন্মভূমির ঘাসে তা নামিয়ে রাখতে। জানি কাজটি কঠিন। তবে শৈশবে ওই হরমোন সমস্যার কারণে যে কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, এর চেয়ে কঠিন তো নয়।

আমার ওপর তাই বিশ্বাস রেখো। আমি তোমাকে নিরাশ করব না প্রিয় আর্জেন্টিনা। প্রিয় জন্মভূমি। প্রিয়তম স্বদেশ।

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি