প্রধান সূচি

বার কাউন্সিল নির্বাচনে আওয়ামীপন্থীদের চমকের নেপথ্যে ঐক্য

Bar-Council

সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পরাজয়ের পর নতুন উদ্যোমে ঘুরে দাঁড়িয়ে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ মনোনীত সাদা প্যানেল। সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনের পর এবার বার কাউন্সিল নির্বাচনে ঐক্য সুদৃঢ় হয়েছে।

নির্বাচন পরিচালনার জন্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদকে আহ্বায়ক করা হয়। একই সঙ্গে দুই সংগঠন বিলুপ্ত করে নতুন সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বে এবারের বার কাউন্সিল নির্বাচনে সাদা প্যানেল চমক দেখিয়েছে। পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রের কঠোর নজরদারি এই সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।

বেশ কিছু আইনজীবী সমিতিতে সরকারী আইনকর্মকর্তা, দলীয় পদধারী আইনজীবীদের নির্লিপ্ততা ও অনুপস্থিতি না থাকলে পূর্ণ প্যানেলই আরও বেশি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হতো বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। বিগত ২১ ও ২২ মার্চ সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল কয়েক নেতার আত্মঘাতী ভূমিকার বিষয়টি দলীয় প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোরভাবে গ্রহণ করায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায়, বেশ কিছু নেতা সতর্ক হয়ে যান। প্রকাশ্যে কোন বিরোধ ও আত্মঘাতী ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি। এ ছাড়া সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে পরাজয়ের পর মাঠ পর্যায়ে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী কার্যক্রমে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদকে আহ্বায়ক করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। জেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদক এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের কে নির্বাচনে ভূমিকা রাখার জন্য দলের পক্ষ থেকে বার বার নির্দেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদকে একীভূত করে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠন করার ফলে সাংগঠনিক বিরোধ কমে যায়।

অপর একটি সূত্র জানায়, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নিজেই নির্বাচনী কার্যক্রম মনিটর করেন। এ ছাড়া প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিলুপ্ত ঘোষিত উভয় সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আসা হয়। সে ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী ঐক্য প্যানেলের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনোনয়ন পান। আইনজীবীগণ প্রার্থী বিবেচনার ক্ষেত্রে সব চেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী পান সাদা প্যানেলে আওয়ামী লীগ সমির্থিত আইনজীবীদের । প্রকাশ্যে কোন বিরোধে লিপ্ত হতে পারেনি অনেকেই। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে বার কাউন্সিল নির্বাচনে পরাজিত হলে ভয়াবহ সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়।

এ বিষয়টি মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী পন্থী আইনজীবীগণ ভালভাবে গ্রহণ করেছেন। ফলে অধিকাংশ বার সমিতিতে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের উর্ধে ওঠে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা হয়। তবে সার্বক্ষণিক ভোট পাওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল শীর্ষ কয়েকজন প্রার্থীর মধ্যে। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভোট কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা করেছে কোন কোন প্রার্থী করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হয়ে এক প্রার্থী প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন। তিনি গাজীপুর, ঢাকা আইনজীবী এবং সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতিতে প্রকাশ্যে সাদা প্যানেলের বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন।

আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারককারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এবারের নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে ১২টিতেই জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। আর ২টি পদে জয় পেয়েছেন বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা। এর মধ্যে সাধারণ ক্যাটাগরিতে ৭টি পদের মধ্যে আওয়ামীপন্থী প্যানেল থেকে ছয়জন নির্বাচিত হয়েছেন। এই প্যানেল থেকে সাধারণ ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়েছেন বার কাউন্সিলের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার, এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুয়ায়ুন, এ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম (জেড আই) খান পান্না, এ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম, এ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান বাদল। আর সাধারণ ক্যাটাগরিতে বিএনপিপন্থী প্যানেল থেকে একমাত্র বিজয়ী হলেন সাবেক এ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী।

অন্যদিকে গ্রুপ ভিত্তিক সাতটি পদের মধ্যে গ্রুপ-এ থেকে এ্যাডভোকেট কাজী নজিবুল্লাহ হিরু, গ্রুপ-বি থেকে মোঃ কবির উদ্দিন ভুঁইয়া, গ্রুপ-ডি থেকে এ এফ মোঃ রুহুল আনাম চৌধুরী, গ্রুপ-ই থেকে পারভেজ আলম খান, গ্রুপ-এফ থেকে মোঃ ইয়াহিয়া এবং গ্রুপ-জি থেকে রেজাউল করিম মন্টু বিজয় লাভ করেছেন। আর গ্রুপ-সি থেকে বিএনপি সমর্থিত এ্যাভোকেট মোঃ দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছেন। বার কাউন্সিলের আইনানুসারে ১৫ সদস্যের কাউন্সিলে এ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ১৪ জন সদস্য নির্বাচিত হন। যার মধ্যে সাতজন সাধারণ ক্যাটাগরিতে ও সাতজন আঞ্চলিক ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হন। নির্বাচিত এই ১৪ সদস্য নিজেরা ভোটের মাধ্যমে একজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ হলো তিন বছর।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ বলেন, এবারের চমক হয়েছে ঐক্যের কারণে। সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে কোন ঐক্য ছিল না। এবারের বার কাউন্সিলের নির্বাচনে সেই ঐক্যটা সুদৃঢ় হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা ঐক্য বদ্ধ হওয়াতে আমাদের জয় হয়েছে। আমাকেও নির্বাচনে কাজ করতে হয়েছে প্রধান সমন্বয় হিসেবে। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হারা যাবে না। আস্থাহীনতাটা কেটে গেছে। কিছু সিনিয়র আইনজীবী নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তবে তাদের তেমন অনুসারী নেই। পক্ষে কাজ করেননি, তবে বিপক্ষেও যাননি। আমাদের এক প্রার্থী পিসি গুহ হেরে গেছেন । এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আশাবাদী ছিলাম। তিনি কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের চীফ প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, তিনটি কারণে আমরা সুপ্রীমর্কোট আইনজীবী সমিতিতে হেরেছি। আর তিনটি কারণে বার কাউন্সিলের নির্বাচনে জয়লাভ করতে পেরেছি। বার কাউন্সিলের নির্বাচনে আমাদের প্যানেলে সাধারণ আসনে ৭ জন যোগ্যপ্রার্থী ছিলেন। আঞ্চলিক আসনেও ৭ জন স্ব স্ব অঞ্চলের যোগ্যতম প্রার্থী। দ্বিতীয়ত, এখানে আমাদের বিরোধ যে প্যানেল (নীল) প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে যোগ্যতম কম। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের শক্তির আইনজীবীগণ উজ্জীবিত হয়েছেন। সেটার কারণেই বার কাউন্সিলের নির্বাচনে অর্জনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মধ্যে দুই একজন আইনজীবী ব্যক্তিগত চিন্তভাবনার কারণে নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এইচ এ এম জহিরুল ইসলাম খান (জেড আই খান পান্না) বলেন, ঢাকার বাইরে সাদা প্যানেলের জনপ্রিয়তা অধিক। সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে আমরা বেশি ঘনিষ্ঠ। নিরপেক্ষভাবে কাজ করি। সে কারণেই সাধারণ আইনজীবীগণ আমাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন।

সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচনী কর্মকান্ডে কোনরূপ কোন্দল বা অভ্যন্তরীণ সঙ্কট না থাকায় বার কাউন্সিলের নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভব হয়েছে।

খবর-জনকণ্ঠের